ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে অস্বস্তির এক নাম পলাতক শেখ হাসিনা। ভারতে তার অবস্থান এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়া নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে। তাকে ফেরত চায় ঢাকা। বিষয়টি নিয়ে দিল্লির সঙ্গে চাপা দূরত্ব চলছে।
কিন্তু দুই দেশের সম্পর্ক শুধু হাসিনা ইস্যুতে আটকে থাকার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ ও নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আছে বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বও।
এসব ইস্যুর সঙ্গে সরাসরি বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ জড়িত। তাই বর্তমান রাজনৈতিক অস্বস্তির মধ্যেও এসব বিষয়ে নজর দেয়া জরুরি। ঢাকার উদ্বেগগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে দিল্লিকে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের আস্থাও অর্জন করতে হবে।
শুধু কোনো একটি রাজনৈতিক দল বা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দিয়ে টেকসই সম্পর্ক গড়া সম্ভব নয়। সম্পর্ককে যেতে হবে জনগণের কাছে। দাঁড়াতে হবে পারস্পরিক স্বার্থের ওপর। আর সেখানেই ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক পুনর্গঠনের বড় চ্যালেঞ্জ।
গঙ্গা-তিস্তা সমস্যা সমাধানে দিল্লির কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন: পানি নিয়ে বাংলাদেশের প্রধান অভিযোগের জায়গাটি খুব স্পষ্ট। এখানে অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা এবং নদীগুলোর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি জড়িত। ভারত চাইলে এই জায়গায় বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব। কারণ অভিন্ন নদীগুলোর উজানে ভারতের অবস্থান। নদীগুলোর পানিপ্রবাহের ওপরও ভারতের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের ওপর।
চলতি বছরে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ভারতকে বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন চুক্তি নিয়ে খোলামেলা ও গঠনমূলক আলোচনায় বসতে হবে। একইভাবে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা চুক্তির বিষয়টিও আর রাজনৈতিক কারণে আটকে রাখা উচিত নয়। সমাধানের দিকে এগিয়ে নেয়া প্রয়োজন। ২০১১ সালে চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার পরও এত বছর ধরে এটি বাস্তবায়িত হয়নি।
দুই দেশের ৫৪টি অভিন্ন নদী নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি একটি যৌথ ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। কখন কতো পানি ছাড়া হবে, বন্যার আগাম তথ্য কীভাবে দেয়া হবে, নদীর নাব্যতা কীভাবে ধরে রাখা হবে, দূষণ কীভাবে কমানো হবে-এসব বিষয়ে নিয়মিত তথ্য বিনিময় ও সমন্বয় দরকার। ভারতের পক্ষ থেকে এ ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা ও সহযোগিতার মনোভাব দেখানো জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারত চাইলে পানি প্রশ্নে বাংলাদেশের মানুষের আস্থা অনেকটাই ফিরিয়ে আনতে পারে।
সীমান্তে হত্যা বন্ধের পাশাপাশি দিতে হবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা: বাংলাদেশ-ভারতের প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার সীমান্ত দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই দীর্ঘ সীমান্তে মাদক ও চোরাচালান, মানব পাচার, অবৈধ পারাপারসহ নানা ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় দুই দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে সীমান্তে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি কোনোভাবেই স্বাভাবিক বিষয় হতে পারে না।
সীমান্ত হত্যা এবং ভারত থেকে বাংলাদেশে ‘পুশইন’ নিয়ে ঢাকার যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেটিও ভারতের গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। ভারতের জন্য এখানে সবচেয়ে বড় করণীয় হলো সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধ করা। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান বিবেচনা হিসেবে নিতে হবে।
অপরাধ দমনের প্রয়োজন আছে। কিন্তু কোনো সীমান্তবাসীকে গুলি করে হত্যা করা তার সমাধান হতে পারে না। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে অপরাধ মোকাবিলায় আরও কার্যকর ও মানবিক পদ্ধতি তৈরি করা সম্ভব।
বাণিজ্যে বড় অংশীদার, কিন্তু ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ: বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার ভারত। দুই দেশের ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে বাণিজ্য বাড়ানোর সুযোগও অনেক। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য শুধু ভারত থেকে পণ্য আমদানি বাড়ালেই হবে না। বাংলাদেশের পণ্যও যেন সহজে ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করতে পারে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
কাগজে-কলমে বাংলাদেশের অনেক পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকলেও বাস্তবে অশুল্ক বাধা, মান যাচাই, কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং নানা ধরনের বিধিনিষেধ রপ্তানির ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করে।
বিশেষ করে সামপ্রতিক সময়ে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি কিছু পণ্যের ওপর স্থলবন্দর দিয়ে আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তৈরি পোশাকসহ কয়েকটি পণ্যকে নির্দিষ্ট সমুদ্রবন্দর দিয়ে প্রবেশের শর্ত দেয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য পরিবহন ব্যয় ও সময় বাড়িয়েছে।
এখানে ভারতের জন্য বড় একটি সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় বাধা কমানো, স্থলবন্দরে দ্রুত কাস্টমস সুবিধা দেয়া এবং অশুল্ক বাধাগুলো সহজ করা গেলে দুই দেশের বাণিজ্য অনেক বাড়তে পারে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা বৃদ্ধি:বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা ইতিমধ্যে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। বর্তমানে বাংলাদেশ ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করছে। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের সক্ষমতাও রয়েছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারির হিসাবে বাংলাদেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা থেকে গ্রিডের মাধ্যমে ১,১৬০ মেগাওয়াট এবং ঝাড়খণ্ডের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আরও ১,৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে।
এখন ভারতের পক্ষ থেকে এই সহযোগিতাকে আরও মানুষের উপকারে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। সবচেয়ে আগে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী দামে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়ছে। তাই শুধু বিদ্যুৎ বিক্রি নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও সাশ্রয়ী দামে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করলে এর সরাসরি সুফল বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও শিল্প খাত পাবে।
প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরে অগ্রগতির সুযোগ কোথায়: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। শোনা যাচ্ছে তিনি খুব শিগগিরই দিল্লি সফরে যাচ্ছেন। আগামী দুই-এক সপ্তাহের মধ্যেই এ সফর হতে পারে। এ নিয়ে উভয় দেশই বেশ তৎপর। এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দুই দেশের মধ্যে যেসব বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে অস্বস্তি বা মতপার্থক্য রয়েছে, শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে সেগুলো নিয়ে সরাসরি আলোচনা হলে সম্পর্ককে নতুনভাবে এগিয়ে নেয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ঢাকার প্রত্যাশাও অনেকটা সেখানেই।
ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, দুই দেশের সরকারপ্রধান একসঙ্গে বসলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও একই ধরনের আশার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, দুই দেশের প্রধান যখন বসেন, তখন অনেক সমস্যা সমাধানের সুযোগ থাকে। ভারতের উচিত সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করা।
প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর হলে দুই পক্ষের সামনে সামপ্রতিক অস্বস্তি কাটিয়ে সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হবে। গঙ্গা-তিস্তা, সীমান্ত, বাণিজ্য ও জ্বালানির মতো বিষয়গুলোতে রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা হলে কিছু অমীমাংসিত বিষয় সমাধানের পথ পেতে পারে।