চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় দেশের আসন্ন সাংবিধানিক রাষ্ট্রনায়ক তথা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। আগামী ২০শে আগস্ট অনুষ্ঠেয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে জাতীয় সংসদে ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তোড়জোড় চলছে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই নির্বাচন প্রধান দলগুলোর মধ্যকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সমঝোতার একটি বড় পরীক্ষা।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপি’র মনোনীত প্রার্থীর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা প্রশ্নাতীত। এ বিষয়ে বাস্তব রাজনৈতিক সমীকরণে বড় কোনো সংশয় থাকার কথা নয়। কারণ বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন এবং সংসদে যে দলের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তার প্রার্থীকে পরাজিত করার মতো সাংসদীয় সমীকরণ তৈরি করা অন্য দলগুলোর পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। ফলে কে রাষ্ট্রপতি হবেন-এই প্রশ্নের উত্তর যতটা সহজ, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি কী ধরনের সাংবিধানিক ভূমিকা পালন করবেন-এই প্রশ্নটি আসলে তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাছাড়া, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই নির্বাচনকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে বড় ভুল হবে। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক পুনর্গঠনের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হচ্ছে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক সমঝোতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে-সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রার্থী রাষ্ট্রপতি হলেই কি রাষ্ট্রপতির প্রতিষ্ঠানটি শক্তিশালী হবে? উত্তর অবশ্যই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘হ্যাঁ’ নয়। সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি সরকারপ্রধান নন, প্রধানমন্ত্রীই নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র। কিন্তু রাষ্ট্রপতি সংবিধানের রক্ষক, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রতীক এবং সংকটকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান। ফলে রাষ্ট্রপতি যদি কেবল ক্ষমতাসীন দলের আনুগত্যশীল রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হন, তাহলে পদটির সাংবিধানিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশের সামপ্রতিক ইতিহাসে এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে রাষ্ট্রপতি প্রতিষ্ঠানকে কখনো কখনো দলীয় রাজনীতির সমপ্রসারণ হিসেবে দেখা হয়েছে। আবার কোনো কোনো সময়ে রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষার প্রতীকী ভূমিকা পালন করেছেন। তাই এবারের নির্বাচনের আসল তাৎপর্য শুধু নির্বাচিত ব্যক্তির নাম, পরিচয়ে আবর্তিত নয়। বরং তিনি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন কিনা, তার ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল।
সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বিএনপি’র রাষ্ট্রপতি প্রার্থী জয়ী হবেন-এটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু এখানেই বিএনপি’র সামনে একটি বড় রাজনৈতিক সুযোগও রয়েছে। দলটি চাইলে এমন একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিতে পারে বা পারতো, যিনি শুধু দলের আস্থাভাজন নন, একই সঙ্গে বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছেও গ্রহণযোগ্য। এতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক বৈধতার পাশাপাশি নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈধতাও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে বা ছিল।
অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর জন্যও এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাস্তবতা মেনে নিয়ে তারা যদি রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর যোগ্যতা, সাংবিধানিক দৃষ্টিভঙ্গি, ব্যক্তিগত সততা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তার অবস্থান নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করে, তাহলে সংসদীয় গণতন্ত্রের মান বাড়বে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে নিছক ‘জিতলো কে, হারলো কে’-এই দ্বিদলীয় প্রতিযোগিতায় নামিয়ে আনা উচিত নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত-বাংলাদেশ কেমন রাষ্ট্রপতি চায়?
আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রার্থী জয়ী হওয়া গণতন্ত্রের পরাজয় নয়। সংসদীয় ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়াই স্বাভাবিক। গণতন্ত্রের মান নির্ধারিত হবে বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ দল তার ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করছে তার মাধ্যমে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা যদি একচ্ছত্রতার দলীয় ও ব্যক্তিগত সংস্কৃতি তৈরি করে, তাহলে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হবে। আর সংখ্যাগরিষ্ঠতা যদি দায়িত্বশীলতা, পরামর্শ ও সংযমের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে। এটাই দেখার বিষয়।
এ কারণেই এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিএনপি’র জন্যও একটি পরীক্ষা। তারা কি কেবল নিজেদের রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে প্রার্থী বাছাই করবে, নাকি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় একজন সাংবিধানিক রাষ্ট্রনায়ক বা constitutional statesman নির্বাচন করবে? একজন রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে বড় যোগ্যতা কেবল রাজনৈতিক আনুগত্য নয়। বরং সংবিধানের প্রতি আনুগত্য, প্রতিষ্ঠানগত নিরপেক্ষতা, সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের সব নাগরিককে প্রতিনিধিত্ব করার মানসিকতা।
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো-কোনো ব্যক্তি, দল বা সরকারের হাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত করা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। তাই নতুন রাষ্ট্রপতি যদি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক বাংলাদেশের প্রতীক হতে চান, তাকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি দল বা সরকারের রাষ্ট্রপতি নন, তিনি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি তথা সাংবিধানিক রাষ্ট্রনায়ক।
বলার অপেক্ষা রাখে না, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরই রাজনীতির মাঠে শুরু হবে আসল পরীক্ষা। রাষ্ট্রপতি কি ক্ষমতাসীন দলের প্রতি রাজনৈতিক সৌজন্য বজায় রেখেও সাংবিধানিক দায়িত্বে স্বাধীনতা প্রদর্শন করতে পারবেন? সরকার ও সংসদের সঙ্গে সমন্বয় করেও কি রাষ্ট্রপতি পদটির স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে পারবেন? রাজনৈতিক সংকট দেখা দিলে কি তিনি দলীয় অবস্থানের পরিবর্তে সংবিধানের অবস্থানকে অগ্রাধিকার দেবেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অতীতের মতো নিছক একটি নির্বাচন ছিল, নাকি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগত পদক্ষেপ।
অতএব, রাষ্ট্রপতি কে হবেন-সম্ভবত সেটি বড় রহস্য নয়। বরং তিনি কেমন রাষ্ট্রপতি হবেন-সেটিই এখন বাংলাদেশের বড় প্রশ্ন। কারণ, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জয় নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু ইতিহাসে মর্যাদা অর্জন করতে হলে প্রয়োজন সংবিধান, রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বঙ্গভবনের জন্য এখন এমন একজন রাষ্ট্রপতিই প্রয়োজন, যিনি দলীয় বিজয়ের প্রতিনিধি নন, বরং রাষ্ট্রীয় ঐক্য, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং গণতান্ত্রিক সংযমের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন।
রাজনৈতিক উত্থান-পতনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের সামনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু একজন ব্যক্তিকে বঙ্গভবনে বসানোর প্রক্রিয়া নয়: নতুন বাংলাদেশের সাংবিধানিক ভারসাম্য, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদারও পরীক্ষা। অতীতের রাজনীতিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদটি এক ধরনের সাংবিধানিক ঢ়ধৎধফড়ী হয়েছে নানা কারণে। পদটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদগুলোর একটি, কিন্তু বাস্তব নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রে রাষ্ট্রপতি নন। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হন এবং রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে তার অবস্থান সর্বোচ্চ। কিন্তু অধিকাংশ সাংবিধানিক কার্যাবলি তাকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী সম্পাদন করতে হয়।
কিন্তু ২০২৬ সালের বাংলাদেশের বাস্তবতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা। সদ্য নির্বাচিত সরকার, জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস, রাষ্ট্র সংস্কারের বিতর্ক, প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থার সংকট এবং পরিবর্তিত আঞ্চলিক ভূরাজনীতির মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। ফলে এবার বঙ্গভবনে কে বসবেন-এই প্রশ্নের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কী ধরনের রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের প্রয়োজন? কারণ, এটি নিছক ব্যক্তি নির্বাচনের প্রশ্ন নয়, রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণের প্রশ্ন।
বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতিকে অনেক সময় আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এই ধারণা রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক গুরুত্বকে পুরোপুরি ধারণ করে না। রাষ্ট্রপতি সরকারের বিকল্প নির্বাহী নন-এটি সত্য। কিন্তু তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা, জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রতীক। আর এখানেই নিহিত নতুন রাষ্ট্রপতির প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ। তাকে একই সঙ্গে হতে হবে সরকারের সঙ্গে সাংবিধানিকভাবে সমন্বিত এবং রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ। দলীয় সরকারের সঙ্গে সাংবিধানিক সহযোগিতা করতে হবে, কিন্তু দলীয় সরকারের রাজনৈতিক সমপ্রসারণে পরিণত হওয়া যাবে না।
এই ভারসাম্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম। কারণ বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ যদি ক্ষমতাসীন দলের আনুগত্যের পুরস্কারে পরিণত হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির সাংবিধানিক মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার রাষ্ট্রপতি যদি নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন, তাহলেও সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হতে পারে। অতএব, নতুন রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হবে দলীয় আনুগত্য নয়, সাংবিধানিক আনুগত্য এবং গণতান্ত্রিক ভারসাম্য।
এবার প্রেক্ষাপটটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সদ্য-বিগত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৬ সালের জুলাইয়ে পদত্যাগের পর স্পিকার অস্থায়ীভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির কার্যাবলি পালন করেন। এই শূন্যতা এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ইতিমধ্যেই অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কার ও সাংবিধানিক পুনর্বিন্যাস নিয়ে বিতর্কও অব্যাহত। ফলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সাধারণ সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি হবে জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্রের সাংবিধানিক চরিত্রের প্রথম বড় প্রতীকী পরীক্ষা।
বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। সংসদ সদস্যরাই তাকে নির্বাচিত করেন। এই পদ্ধতির একটি যুক্তি আছে। সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির সরাসরি নির্বাচনের প্রয়োজন নেই। বরং সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে একজন সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হলে সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে সংঘাতের সম্ভাবনা কমে।
কিন্তু এর বিপরীত যুক্তিও আছে। যদি সংসদে একটি দলের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে এবং সেই দলের মনোনীত ব্যক্তিই প্রায় নিশ্চিতভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাস্তবে জনগণের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক পছন্দের প্রতিফলন না হয়ে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে পরিণত হয়। সুতরাং নতুন রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রে ব্যক্তি নির্বাচন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হবে নির্বাচনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
যদিও বাস্তবতা ভিন্ন, তথাপি ক্ষমতাসীন দল চাইলে এমন একজনকে নির্বাচন করতে পারে: ১). যিনি শুধু দলীয় আনুগত্যের প্রতীক কিংবা ২). যিনি রাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য। দ্বিতীয় পথটিই গণতন্ত্রের জন্য অধিকতর ফলপ্রসূ।
নতুন রাষ্ট্রপতির সামনে থাকবে অনেক চ্যালেঞ্জ। প্রথম চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদটির সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি কোনো দলের রাষ্ট্রপতি নন। তিনি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি। এই পার্থক্যটি সাংবিধানিকভাবে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তার চর্চা ততটাই দুর্বল।
এজন্য, একজন রাষ্ট্রপতিকে এমন অবস্থান তৈরি করতে হবে যেখানে বিরোধী দল তার কাছে যেতে পারে, ভিন্নমতাবলম্বীরা আস্থা পেতে পারে, নাগরিক সমাজ তাকে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখতে পারে এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো তার কার্যালয়কে রাজনৈতিক পক্ষপাতের বাইরে ভাবতে পারে। রাষ্ট্রপতির হাতে সীমিত নির্বাহী ক্ষমতা থাকলেও তার moral authority বা নৈতিক কর্তৃত্ব অনেক বড় হতে পারে। একজন বিচক্ষণ রাষ্ট্রপতি এই নৈতিক কর্তৃত্বকে রাষ্ট্রীয় ঐকমত্য তৈরির কাজে ব্যবহার করতে পারেন।
নতুন রাষ্ট্রপতির সামনে দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক। বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ কার্যাবলি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শনির্ভর করেছে। অতএব নতুন রাষ্ট্রপতির জন্য প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবার কোনো সুযোগ নেই। আবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সমপ্রসারিত রাজনৈতিক কার্যালয়ে পরিণত হওয়াও রাষ্ট্রপতির মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সম্পর্ক হওয়া উচিত constitutional cooperation without political subordination&Z অর্থাৎ সাংবিধানিক সহযোগিতা, কিন্তু রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ নয়।
রাষ্ট্রপতি প্রয়োজনে প্রশ্ন তুলতে পারেন, ব্যাখ্যা চাইতে পারেন, সতর্ক করতে পারেন, রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বিষয় প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনতে পারেন। সংবিধানের ৪৮(৫) অনুচ্ছেদেও রাষ্ট্রপতিকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির বিষয়ে অবহিত রাখার কথা বলা হয়েছে। এই সাংবিধানিক সম্পর্কের পরিণত চর্চা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন মানদণ্ড তৈরি করতে পারে।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্রের ক্ষত সারানো। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শুধু সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের মধ্যেও একটি গভীর প্রশ্ন তুলেছে। রাষ্ট্র কি নাগরিকের অধিকার রক্ষা করবে? প্রতিষ্ঠান কি দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে থাকবে? আইন কি সবার জন্য সমান হবে? বিরোধী মত কি রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে বিবেচিত হবে, নাকি গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে স্বীকৃত হবে?
নতুন রাষ্ট্রপতির সামনে এসব প্রশ্নের সরাসরি নির্বাহী সমাধান নেই। কিন্তু তিনি রাষ্ট্রের constitutional conscience বা সাংবিধানিক বিবেকের ভূমিকা পালন করতে পারেন। তার ভাষণ, জাতীয় দিবসের বক্তব্য, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অবস্থান এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যদিয়ে তিনি একটি বার্তা দিতে পারেন-রাষ্ট্র কোনো দল বা সরকারের সম্পত্তি নয়, রাষ্ট্র জনগণের। এই বার্তাটিই হতে পারে জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় দর্শন।
চতুর্থ চ্যালেঞ্জ বিচার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা হলো দণ্ড মওকুফ, লঘু করা, স্থগিত করা বা পরিবর্তনের ক্ষমতা। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদে এই prerogative ড়ভ সবৎপু-এর কথা বলা হয়েছে। এই ক্ষমতা অত্যন্ত সংবেদনশীল। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, গণ-আন্দোলনের পর বিচার, মানবাধিকার, দণ্ডিত ব্যক্তির অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমার প্রশ্ন সামনে এলে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের নৈতিক চরিত্রের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নতুন রাষ্ট্রপতির প্রয়োজন হবে আইন, ন্যায়বিচার এবং মানবিকতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার রাজনৈতিক ও নৈতিক সক্ষমতা। অতীতের মতো ক্ষমা যেন রাজনৈতিক পুরস্কার না হয়। আবার প্রতিশোধ যেন বিচারব্যবস্থার বিকল্প না হয়-এই সূক্ষ্ম সীমারেখা রক্ষা করা হবে বড় পরীক্ষা।
রাষ্ট্রপতির সামনে পঞ্চম চ্যালেঞ্জ সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক বিষয়ক। রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। ফলে তার সঙ্গে সামরিক নেতৃত্বের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। তবে আধুনিক গণতন্ত্রে সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ সাংবিধানিক নেতৃত্বের অর্থ রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নয়; বরং পরারষরধহ supremacy under the Constitution নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রপতিকে সামরিক বাহিনীর মর্যাদা, পেশাদারিত্ব ও সাংবিধানিক ভূমিকা রক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে সামরিক প্রতিষ্ঠানকে দলীয় রাজনীতির বাইরে রাখার বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় নীতিও সমর্থন করতে হবে।
ষষ্ঠ চ্যালেঞ্জ বৃহত্তর ভূরাজনীতির বিষয়। নতুন রাষ্ট্রপতির সময় বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সামপ্রতিক টানাপড়েন দেখিয়ে দিয়েছে যে, প্রতিবেশী সম্পর্ক কেবল আবেগের বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, বাণিজ্য, পানি, সীমান্ত, আঞ্চলিক সংযোগ এবং ভূরাজনীতির সমন্বিত প্রশ্ন। সামপ্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপড়েন নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাষ্ট্রপতি সরাসরি পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করবেন না। কিন্তু তিনি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশের sovereignty dignity and constitutional continuity-এর প্রতীক এবং জাতীয় স্বার্থের রক্ষক। তার কূটনৈতিক ভূমিকা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক-সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপতির বক্তব্য ও রাষ্ট্রীয় সফর বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানের একটি প্রতীকী মাত্রা বহন করবে।
সপ্তম চ্যালেঞ্জ হলো রাষ্ট্রপতি কি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হতে পারবেন? এটাই সম্ভবত সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। বাংলাদেশ এখন রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। জুলাই-পরবর্তী রাজনীতিতে নতুন শক্তির উত্থান হয়েছে, পুরনো শক্তির অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে, ছাত্ররাজনীতি নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্ম দিয়েছে এবং রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্নও নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি যদি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন, তাহলে বিভাজন আরও গভীর হতে পারে।
কিন্তু তিনি যদি বলতে পারেন-“আমি সরকারের নই, আমি রাষ্ট্রের; আমি কোনো দলের নই, আমি সংবিধানের; আমি কোনো গোষ্ঠীর নই, আমি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি”-তাহলে তার পদটি সত্যিকার অর্থেই জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হতে পারে।
সামগ্রিক বিবেচনায় বঙ্গভবনে পরিবর্তিত বাংলাদেশের এমন একজন রাষ্ট্রপতি দরকার নেই, যিনি কেবল আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেবেন, বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে অভ্যর্থনা জানাবেন এবং সরকারের সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর করবেন। বরং বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একজন রাষ্ট্রপতি যিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে না থেকেও রাষ্ট্রের নৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারেন। যিনি জানবেন কখন নীরব থাকতে হয়, কখন প্রশ্ন করতে হয় এবং কখন সংবিধানের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হয়। যিনি সরকারের সঙ্গে সংঘাতে যাবেন না, কিন্তু সরকারকেও রাষ্ট্রের সঙ্গে একাকার হতে দেবেন না। যিনি বিরোধী দলকে শত্রু মনে করবেন না, আবার রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকেও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার নামে বৈধতা দেবেন না। যিনি জুলাইয়ের শহীদদের স্মরণ করবেন, কিন্তু জুলাইয়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে কোনো একক দলের সম্পত্তি হতে দেবেন না। আর সবচেয়ে বড় কথা, যিনি বুঝবেন-রাষ্ট্রপতির আসন ক্ষমতার আসন নয়; এটি রাষ্ট্রের আস্থার আসন।
বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রাক্কালে তাই আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়-‘কার লোক বঙ্গভবনে যাচ্ছেন?” আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত-“কী ধরনের রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরও পরিণত, প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বাধীন এবং রাষ্ট্রকে আরও মর্যাদাবান করতে পারবেন?”
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে নতুন রাষ্ট্রপতি শুধু একজন সাংবিধানিক পদাধিকারী হবেন, নাকি সত্যিই গণতন্ত্রমুখী নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বিবেকের প্রতীক হয়ে উঠবেন।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিয়নাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।