ফিরে দেখা

মনে যে প্রশ্ন উঁকি দেয়

শামীমুল হক | মতামত
আগস্ট ১৫, ২০২৬
মনে যে প্রশ্ন উঁকি দেয়

দিন যায়, দিন আসে। তবে মাঝে রাতের আঁধারে তলিয়ে যায় দিন। এভাবেই এগুতে থাকে সময়। জন্ম নিতে থাকে ইতিহাস। কখনো ইতিহাস হয় ঐতিহ্যের। গর্বের। গৌরবের। আবার কখনো হয় ঘৃণার। লজ্জার। নির্মম। নির্মোহ। পৃথিবীর দেশে দেশে সরকার প্রধানদের কেউ কেউ ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নিয়েছেন স্বর্ণাক্ষরে। কেউ আবার আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ হয়েছেন। নিজ কর্মকাণ্ডেই তারা তাদের নির্দিষ্ট জায়গা খুঁজে নেন। রাজার আমল, মুঘল আমল, নবাবী আমল, জমিদারি আমল যুগে যুগে দেশ শাসন করেছে। একমাত্র বৃটিশ সাম্রাজ্য চালিয়েছে রানী। এক সময় পৃথিবীতে দেশ দখলের প্রতিযোগিতা ছিল। এ নিয়ে কতো যে যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়েছে-ইতিহাস সাক্ষী। বর্তমান সময়ে বেশির ভাগ দেশ গণতন্ত্রের আবরণে পরিচালিত হচ্ছে। কিছু দেশ এখনো রাজা, আমীররা শাসন করছে। বাংলাদেশ এখন পূর্ণ গণতন্ত্র ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এ গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খেয়েছে। বাঙালি রক্ত দিয়েছে বারবার। রক্তের বিনিময়ে অর্জন করেছে স্বাধীনতা। 

রক্তে কেনা স্বাধীন পতাকায় খামছে ধরেছে অনেকে বহুবার। কিন্তু বাঙালি রক্ত দিতে জানে। আর তাই রক্ত দিয়ে ফিরিয়ে এনেছে তাদের স্বাধীনতা। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনও রক্তে লেখা এক ইতিহাস। দেশের দলমতনির্বিশেষে স্বৈরাচার হটাও আন্দোলনে মাঠে নেমে আসে আমজনতা। আর মাঠে নেমে আসা আমজনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় স্বৈরশাসকের পোষা পোশাকি ও অপোশাকি বাহিনী। জাতিসংঘ জুলাই বিপ্লবে নিহতের সংখ্যা ১৪০০-এর উপরে উল্লেখ করেছে। আহত কমপক্ষে ত্রিশ হাজার। এত রক্তের বিনিময়ে স্বৈরতন্ত্রকে হারিয়ে ফিরিয়ে আনা হয় গণতন্ত্রকে। যেখানে কথা বলার স্বাধীনতা থাকবে। যেখানে মানুষ মন খুলে হাসতে পারবে। যেখানে জবাবদিহিতা থাকবে সরকারের। যেখানে জনগণই হবে সর্বেসর্বা। দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর জগদ্দল পাথরের মতো বসে থাকা নিষ্ঠুরতম স্বৈরাচার শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর বাংলাদেশের সিংহাসনে বসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যার প্রধান হন দেশ-বিদেশের উজ্জ্বল মুখ, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার সরকারে যোগ দেয় জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রদের মধ্য থেকে তিনজন। দেড় বছর তাদের শাসনের পর দেশে অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন উপহার দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। দীর্ঘদিন পর দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে ভোট দেন। শেখ হাসিনা সরকারের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করার পর দেশ থেকে নির্বাচন নির্বাসিত হয়ে যায়। এ থেকে উত্তরণ কখনোই হবে না-এমন ধারণা জন্মায় মানুষের মাঝে। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ভোটারদের মনে আশা জাগায়। ওদিকে আশাজাগানিয়া নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। আর সরকার প্রধান হন বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দেখতে দেখতে সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে এ মাসেই। এ সময়ে সরকার জনগণের মনের আশা কতোটুকু পূরণ করতে পেরেছে? এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই মনে উঁকি দেয়। আর উত্তরও সবার সামনে হাজির। কারণ সরকার যা করছে প্রকাশ্যে করছে। 

 

বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জনগণের পাল্‌স বুঝে কাজ করছেন। তিনি সরকার প্রধান হয়ে প্রথম যে কাজটি করেছেন সেটিই ব্যাপক সমাদৃত হয়। একেবারে সাধারণের মতো চলাফেরা। বিশেষভাবে খেয়াল না করলে প্রধানমন্ত্রীর যাওয়া-আসার পথে কেউ বুঝতেও পারে না প্রধানমন্ত্রী যাচ্ছেন। অথচ বিগত ষোল বছর আমরা দেখেছি প্রধানমন্ত্রী কোনো রাস্তা দিয়ে গেলে ওই রাস্তা কমপক্ষে একঘণ্টা আগেই বন্ধ করে দেয়া হতো। শুধু তাই নয়, রাস্তা পারাপারও হওয়া যেতো না। গোটা রাস্তায় থাকতো পুলিশ আর পুলিশ। এ যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তারপর সকাল ৯টায় সবার আগে সচিবালয়ে অফিস করতে যাওয়া আরেক ইতিহাস। সরকার গঠনের ১৯ দিনের মাথায় ফ্যামিলি কার্ডের উদ্বোধন করে দেশবাসীকে জানান দিয়েছেন তার দেয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে ছাড়বেন। তার বুদ্ধিমত্তায় দেশবাসী দিন দিন অবাক হচ্ছেন। ১৯৯১ সালে তারেক রহমানের মা দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। সে সময় কৃষকের ৫ হাজার টাকা ব্যাংক লোন মাফ করে দেন। আর তিনি এসে সেই ক্ষুদ্র কৃষকদের দিকে প্রথমেই নজর দেন। তাদের ব্যাংক ঋণ ১০ হাজার টাকা মওকুফ করে দেন। কৃষকদের মাথা থেকে ঋণের বোঝা ঝেড়ে ফেলেন। এরপর কৃষক কার্ড চালু করেন। স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার দেশটাকে ফোকলা করে গেছেন-এটি সবাই জানেন। দুর্নীতির মহাযজ্ঞ ছিল গোটা দেশ। মিথ্যার ফুলঝুরিতে জনগণকে আটকে রাখাই ছিল সেই সরকারের কাজ। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়েই দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার কাজে হাত দেন। 

 

তার মন্ত্রিসভাকে কঠোর নজরদারিতে রাখছেন তিনি। আর সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি তিনি তার বেতন থেকে একটি অংশ প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দান করে দিচ্ছেন। এবার আসা যাক জ্বালানির বিষয়ে। গোটা বিশ্বে জ্বালানির দাম বাড়লেও প্রথমে তিনি দেশের মানুষের কথা চিন্তা করে জ্বালানির দাম বাড়াননি। আমেরিকা-ইসরাইল ও ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের বাজার গোটা বিশ্বে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এর রেশ বাংলাদেশেও পড়ে। কিন্তু যতদিন সম্ভব তিনি দাম না বাড়িয়ে চালিয়ে যান। পড়ে দাম বাড়ালেও তা যৎসামান্য। এসবই তিনি করছেন দেশের মানুষের কথা চিন্তা করে। এ ছয় মাসে স্বাধীন সাংবাদিকতার উপর তিনি ছড়ি ঘোরাননি। স্বাধীন মতামতের উপরও কোনো বাধা-বিপত্তি দেখা যায়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘ধীরে চলো নীতি’ গ্রহণ করে এগিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এই এগিয়ে যাওয়াতেও প্রতি পদে পদে বাধাগ্রস্ত হতে দেখা যায়। যা তিনি বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। তার এসব গুণাবলি তার পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কথা মনে করিয়ে দেয়। তার মা বেগম খালেদা জিয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। সংসদে দাঁড়িয়ে যখন প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতাদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধার সঙ্গে কথা বলেন তখন গোটা সংসদ টেবিল চাপড়ে তাকে উৎসাহ দেন। তার একের পর এক কর্মকাণ্ডে মানুষ বলতে শুরু করেছে এমন প্রধানমন্ত্রীই দেশের জন্য দরকার। 
 

এবার আসা যাক, অন্য প্রসঙ্গে। প্রধানমন্ত্রীর একার পক্ষে সরকারের সুনাম ধরে রাখা সম্ভব নয়। এর জন্য মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে একেবারে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু জেলা-উপজেলায় বিএনপি’র অনেক নেতা তাদের কর্মকাণ্ড দিয়ে বিএনপি’র দুর্নাম কুড়াচ্ছে। এসব কঠোর হাতে দমন করতে হবে। এবং এখনই দমন না করলে প্রধানমন্ত্রীর ভালো কাজগুলোও প্রশ্নের মুখে দাঁড়াবে। এই তো রাজশাহীতে ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে যা হলো তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে ফ্যামিলি কার্ড শুমারিতে জনবল নিয়োগ নিয়ে দলীয় চাপে বিব্রত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা। তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব, পক্ষপাতিত্ব এবং যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দেয়ার অভিযোগ তুলেছেন খোদ বিএনপি নেতারাই। কোথাও কোথাও বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করেছেন, কোথাও আবার নিয়োগের ফল বাতিলের দাবি  তোলা হয়েছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চাঁদা না পেয়ে প্রকৌশলীর ওপর যুবদল নেতার হামলাও আলোচনায় এসেছে। 

 

খোদ ঢাকায় নিউমার্কেটের বলাকা সিনেমা হলের সামনের ফুটপাথে দোকান বসানোকে কেন্দ্র করে ঢাকা কলেজ ছাত্রদল ও নিউমার্কেটের যুবদল নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা অব্যাহত থাকলে বিএনপি’র ছয় মাসের যে অর্জন তা তলিয়ে যাবে। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতাদের এখনই মনোযোগ দেয়া দরকার। মনে রাখতে হবে হাসিনা সরকারের সময় এসব ছিল নিত্য ঘটনা। ফলে দিন দিন মানুষ তাদের উপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ষোল বছরের চরম অরাজকতা, দুর্নীতি, অপকর্ম হাসিনা সরকারকে তলানিতে নিয়ে পৌঁছায়। দেশবাসী আর এমনটা দেখতে চায় না। তাই বিএনপি’র শীর্ষ নেতাদের এ ব্যাপারে শতভাগ কঠোর হতে হবে। প্রয়োজনে এসব নেতাকে দল থেকে বাদ দিতে হবে। তারপরও দলকে স্বচ্ছ রাখতে হবে। মানুষ যেভাবে, যে আশা নিয়ে লাইন ধরে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে- বিএনপিকেও সে আশা পূরণে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। প্রয়োজনে এসব নেতা বাছাই করতে গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্য নিতে পারে দলটি। 

 

মতামত'র অন্যান্য খবর