বাংলাদেশের গণমাধ্যম দাঁড়িয়ে আছে একটি ধারালো ছুড়ির উপরে। যেকোনো মুহূর্তে এটা পড়ে যেতে পারে। একটা সেলফ সেন্সরশিপ কাজ করছে অনেকের মধ্যেই। একটা সময় সাংবাদিকতায় কোয়ালিটি ছিল, রাজনীতি ছিল না। মিডিয়ার চালচ্চিত্র, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, বিশ্বকাপ ফুটবল কভারের অভিজ্ঞতাসহ নানা প্রসঙ্গ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন মানবজমিন প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী। মুখোমুখি হয়েছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক সাবির মুস্তাফার। টিবিএস পডকাস্ট ‘কনভারসেশন উইথ সাবির মুস্তাফা’র বিস্তারিত জনতার চোখ-এর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-
প্রশ্ন: আপনি সম্প্রতি আমেরিকায় গিয়েছিলেন। সেখানে বিশ্বকাপের বিভিন্ন খেলা দেখেছেন এবং সেখানে ফিফা’র রাজনীতি নিয়ে অনেক বিতর্ক, অনেক কন্ট্রোভার্সি হলো। তো এই রাজনীতিটা ফুটবল খেলার সময় ফিফা’র সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সম্পর্ক তারপরে আর্জেন্টিনা নিয়ে যে বিতর্ক- বলা হচ্ছে ফিফা আর্জেন্টিনাকে ফেভার করছে এগুলোর রেশ বা আঁচ আপনারা পাচ্ছিলেন কিনা?
প্রশ্ন: আমরা কিছুটা আঁচ পাচ্ছিলাম এই কারণে যে, আর্জেন্টিনা ন্যাশনাল ফুটবল টিমের ফুটবল এসোসিয়েশন সম্পর্কে একটা রিপোর্ট বের করেছিল স্প্যানিশ একটা টেলিভিশন। সেখানে করাপশনের খবর ছিল। সেখানে রিপোর্ট থেকে একটা গুঞ্জন ছিল এরকম হতে পারে। ঐরকম রিপোর্টিং হয়নি কিন্তু আসলে। আমি বিশ্বকাপে গিয়েছি সাতবার। আমি প্রথম বাংলাদেশি সাংবাদিক ১৯৯০ সনে ইতালি বিশ্বকাপে গিয়েছিলাম। খেলার প্রতি আমার একটা আলাদা আগ্রহ আছে। একটা নেশাও বলা চলে আর কি। আর খেলা কাভার করতে গিয়ে এই ধরনের রাজনীতি হয়তো এবার একটু বেশি হয়েছে। এই রাজনীতিটা নোংরামি ছাড়া কিছু নয়। এটা ফুটবলকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং করেছে অলরেডি এবং ফুটবল বিশ্ব দু’টি ক্যাম্প হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই।
প্রশ্ন: আপনি সাতবার বিশ্বকাপ কাভার করেছেন। রাশিয়ায় যাননি। এই সাতটা ওয়ার্ল্ডকাপের মধ্যে কোনটা আয়োজনের দিক থেকে আপনার কাছে সবচেয়ে ভালো মনে হয়েছে?
উত্তর: জার্মানিতে আয়োজিত বিশ্বকাপ, ২০০৬ সালে। এরপর ২০২২ সালে কাতার আর ২০০২ জাপান-কোরিয়া।
প্রশ্ন: ফুটবলের দিক থেকে কোনটা আপনি সবচেয়ে উপভোগ করেছেন?
উত্তর: এবারেরটা খুব ভালো ছিল। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল ম্যাচগুলো। ফুটবলের দিক থেকে এটাও ভালো ছিল এবং ন্যাচারালি ২০০৬-এর জার্মানি বিশ্বকাপ আলোচিত বিশ্বকাপ। আর ’৯৪ সালের বিশ্বকাপ। ম্যারাডোনা যেবার আউট হয়ে গেলেন ড্রাগের কারণে। ড্রাগের কারণে সেটা বেশ আলোচিত ছিল। যতবারই বিশ্বকাপে যাই ততবারই একটা প্রশ্নের সম্মুখীন হই। এবারো হয়েছি এবং আমার ইন্টারভিউ এবার চার ভাষার টেলিভিশনে গেছে। প্রথম হলো যে- তোমাদের দেশ তো বিশ্বকাপে নেই। ১৫২তম তোমাদের অবস্থান। সেখানে তোমরা খালি আর্জেন্টিনা আর্জেন্টিনা বলো কেন? আর্জেন্টিনার লোকজনও বলে সেকেন্ড হোম হচ্ছে বাংলাদেশ। কি কারণে খেলার প্রতি এত নেশা? তোমাদের টিম তো খেলে না। জবাব কি দিবো? বিশেষ করে ইতালি বিশ্বকাপে। যেদিন আর্জেন্টিনা হেরে গেল সেদিন কিন্তু একটা খবর হয়েছিল যে, দিনাজপুরে একটা পরিবারের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে খেলা নিয়ে বিরোধ হতে হতে ডিভোর্স হয়ে গিয়েছিল। একটা বার্তা সংস্থা এই খবরটা দিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে আমার খোঁজ পড়েছে বাংলাদেশে কে আছে? তখন আমি একাই ছিলাম। নব্বইতে তখন আর কেউ যায়নি ওইভাবে। খেলায় এবার সুপারস্টারদের পতন দেখেছি। উত্থান দেখতে পারিনি। নতুন প্লেয়ার কিন্তু আসেনি। হালান্দ প্রথম বিশ্বকাপ খেলছে। সে ভালো খেলেছে।
ইয়ামাল আর হালান্দ। ইয়ামালের আরও ভালো করার কথা ছিল, সে করতে পারেনি। টিম স্পিরিটটাই বেশি ছিল।
তারকানির্ভর টিম আর্জেন্টিনা। মেসি নেই খেলাও নেই। আমি দেখেছি ঐরকমই। খেলা নিয়ে পরে যেটা আপনি প্রশ্ন করেছিলেন যে খেলা নিয়ে রাজনীতি? খেলার প্রশাসন একদম দুর্নীতিগ্রস্ত। এখন খেলা যেনো টাকা বানানোর মেশিন। এর আগের প্রেসিডেন্ট ছিলেন সেফ ব্লাটার। করাপশনের চার্জেই তাকে আউট হতে হয়েছিল। এবারো কিন্তু সেই পথে যাচ্ছিল। কিছুটা আবার এখানে ট্রাম্প সাহেব, ল্যাটিন আমেরিকা, এই সেন্ট্রাল আমেরিকা সব মিলে তারা চেষ্টা করছে তাকে রাখার জন্য। যদিও সে তো সুইস এবং ইতালির নাগরিক। ৫-৭টা দেশ তার বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল। পরে রাবাতে যে মিটিংটা হলো প্রায় পাঁচ/ছয়দিন আগে সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, আপাতত ইলেকশন পর্যন্ত ইনফান্তিনো থাকুক। আর আপাতত কেউ নেই যে সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব নেবে। আর এই ফুটবল ম্যানেজমেন্টে যারা আসেন টাকার কারণে সবাই করাপ্ট হয়ে যায়, আর সিস্টেমটাই করাপ্ট হয়ে গেছে। পুরোটা জিনিসই আবার চেঞ্জ করতে হবে। যেভাবে এই ওয়ার্ল্ড কাপটাকে বিক্রি করার চেষ্টা হয়েছিল। এটা ছিল একটা দুর্ভাগ্যজনক। তাহলে শেষ হয়ে যেত। মার্কিন প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে এবং এই প্রপোজালটা নিয়েই কিন্তু এটা বলেছিল। এই ধরনের প্রস্তাব দেয়ার আগে হোমওয়ার্ক করা উচিত ছিল। এটা তো কেউ একসেপ্ট করবে না।
প্রশ্ন: আপনি সাংবাদিকতা শুরু করেছেন দীর্ঘদিন। বাহাত্তর সন থেকে। আমি আপনাকে চিনি ’৯১ সাল থেকে। ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তন হলো এবং তারপরে দুটি বছর মিডিয়া ছিল টালমাটাল অবস্থা। মালিকানা বদল হয়েছে, তারপরে নিউজ রুমের দখল, বেদখল, পুনর্দখল সবই হয়েছে। এসবের মধ্যে সাংবাদিকতার মূল যে বিষয়, সাংবাদিক স্বাধীনভাবে, নির্ভয়ে কাজ করবে। সাংবাদিক (মালিক নন), সম্পাদক এবং তার টিম। এই জিনিসটা কি ধরে রাখতে পেরেছে বেশির ভাগ মিডিয়া নাকি তারা কোনো একটা ভয়ের মধ্যে দিয়ে গেছে? এখনো যাচ্ছে কি?
উত্তর: আমি বলবো না। তার কারণটা হচ্ছে বেশির ভাগ মিডিয়াতেই এই হাওয়াটা লেগেছে। প্রাইভেট সেক্টরের ব্যবসা এটা। আমার প্রতিষ্ঠানে বা অন্য একজনের প্রতিষ্ঠানে কে কাজ করবে, কে করবে না এটা ডিসাইড করবে সেখানকার অথরিটি। এখন যেভাবে হচ্ছে আমি বলবো এটা এক ধরনের চর দখলের মতো। এভাবে সকাল-বিকাল চেঞ্জ হচ্ছে, একজন এডিটর আছে তাকে সরিয়ে দিয়ে আরেকজন ঢুকে গেল। আবার হয়তো সেটআপে চেঞ্জ করতে হবে আবার পুরোটা চেঞ্জ হয়ে গেল। এই যে অবস্থাটা এখনো কিন্তু অব্যাহত আছে এটা। টিভিতে বলেন, নিউজপেপারে বলেন, দু’টাতেই অব্যাহত আছে এটা। এটা কেউ রেসিস্ট করতে পারেনি। এখানে ইউনিয়নের কোনো ভূমিকাই নেই। ইউনিয়ন আছে এটা মনে হয় না। দুর্ভাগ্য হচ্ছে এখন যে অবস্থাটা সবাই কমেপ্রামাইজ করে বসে আছে। এখানে সরকারের ভূমিকা কি? সরকারও কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে যেভাবে এই হাউসগুলো দখল হয়েছে সেটা তারা রেসিস্ট করতে পারেনি। এর ধারাবাহিকতায় এখনো এটা চলছে। এটা চলতে থাকলে আমি জানি না যে, মিডিয়া কোথায় গিয়ে থামবে? এটা আমার ধারণার বাইরে। কিন্তু আমরা যারা সংবাদ মাধ্যমে কাজ করি, যেমন আমি মালিকদের সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। তারপরে সংবাদপত্র পরিষদের সময় বা সম্পাদক পরিষদের সঙ্গেও আমি যুক্ত। কিন্তু আমরা দেখছি কিছু করতে পারছি না; তার কারণ কি জানেন? অবাক লাগে। কেউ কমপ্লেইন করে না।
প্রশ্ন: এটা কি ভয়ের কারণে না? মনে করছে এটাই হওয়ার কথা?
উত্তর: না, এটা নিয়তি না। অনেকটা মনে করে বলে লাভ কি, আরও সমস্যা হতে পারে। আমার যে বেনিফিট, এটাও নাও পেতে পারি। এই অবস্থা থাকতে পারে না, থাকা উচিত না। যে একটা লোক কমপ্লেইনই করে না। আমি সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, যে কি অবস্থা? বলে যে, আমাদের কাছে তো কেউ কমপ্লেইন করে না। কমপ্লেইন না করলে তো আমরা গিয়ে ওখানে কিছু করতে পারছি না। এই পরিস্থিতি তো আগে ছিল না। সেটা তো আমাদেরও গেছে। কিন্তু তখন তো ইউনিয়ন পাশে দাঁড়িয়ে আছে। এখন তো ইউনিয়ন বলতে নাই- বললেই চলে আর কি। আর একটা ইউনিয়ন তো তারা নাই। তারা দৃশ্যমান না। একটা ইউনিয়ন আছে তারাতো এ নিয়ে চিন্তাও করছে না। ফলে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা একটা মস্ত বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সামনের দিনগুলো খুব খারাপ দিন হবে। কারণ হচ্ছে, টলারেন্স লেভেল একদম জিরো লেভেলে চলে গেছে। রেসপেক্ট বলতে কিছু নেই। এথিঙ বলতে কিছুই নেই। আর সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এখন যা হচ্ছে এরা কেউ কন্ট্রোলের বাইরে চলে গেছে। যে যার মতো যা ইচ্ছা তাই লিখছে, বলছে। দাড়ি-কমা, সেমিকোলন পর্যন্ত আগে মনিটর হতো। এখন এটা করার কোনো সুযোগই নেই। কেউ করছেও না। আমরা যাবো কোথায়?
প্রশ্ন: সোশ্যাল মিডিয়াতে তো সেরকম এডিটোরিয়াল ধরনের গেট কিপিংও নাই। কারণ অনেকে একা একাই একটা অনুষ্ঠান করছে বা কন্টেন্ট ক্রিয়েট করছে।
উত্তর: আমি বলছিলাম যেটা যে, আপনার হাতে মোবাইল থাকলেই আপনি সাংবাদিক। আরেকটা সেলফি স্টিক লাগে। সেটা করার পরে সাংবাদিক হয়ে গেলেন ঠিক আছে ভালো কথা, আমার কোনো আপত্তি নেই। সাংবাদিক হলে আমি ওয়েলকাম করবো। কিন্তু একটা মিনিমাম এথিঙ তো মানতে হবে। আমি নিউজপেপারে কাজ করি, ১০টা হাত হওয়ার পরে একটা স্টোরি সামনে যাচ্ছে। আর এখানে স্টোরি ডাইরেক্ট যাচ্ছে। এখনকার দিনে যেভাবে চলছে তাতে মেইনস্ট্রিম মিডিয়া খুঁজেই পাওয়া যাবে না। হয়তো একদিন এসে বলবে, ঠিক আছে দেখি আসল খবর এটার মধ্যে আছে কিনা। কিন্তু সে পর্যন্ত কে দেখে, এর আগেই তো খবর হয়ে যায়।
আপনি বিশ্বাস করেন, ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোতে আগুন দেয়ার প্রতিবাদে প্রতিবাদ করেছেন সম্পাদক পরিষদ ছাড়া, মালিকদের সংগঠন ছাড়া আমি ইউনিয়নের কোনো অবস্থান দেখিনি। এটা চিন্তা করা যায়! আমি ভিন্নমত, তারা আমাদের মতের বিরুদ্ধে লিখছে বলছে, আমি কাউন্টার করবো। কিন্তু আমি আগুন দিবো!
প্রশ্ন: আপনি যে ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলোর কথা বললেন সেই ভবনে আগুন লাগানোর পরে বেশ কয়েক মাস হয়ে গেছে, নতুন সরকার এসেছে, কিন্তু এটা নিয়ে কোনো তদন্ত, দোষী ব্যক্তিরা তো অজানা নয় এগুলো তো সব ভিডিওতে আছে...
উত্তর: তখনকার তথ্য উপদেষ্টা সৈয়দ রেজওয়ানা হাসান ঘটনার চারদিন পর ঘটনাস্থল দেখতে গেছেন। এটা কি হতে ভাবা যায়! সেটাও তো আমরা দেখলাম। এজন্য বললাম যে, এখন কিন্তু একটা ধারালো ছুরির উপরে দাঁড়িয়ে আছে সংবাদমাধ্যম। যেকোনো মুহূর্তে এটা পড়ে যেতে পারে এবং এটা খুব বিপজ্জনক হবে। তার কারণটা হলো কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
প্রশ্ন: গণমাধ্যমের দায়িত্ব হচ্ছে দেশে যে বিদ্যমান চিন্তাভাবনা, মতামত সবগুলোকে রিফ্লেক্ট করা। আপনি টকশো করছেন, বিভিন্ন টিভিতে বিভিন্ন রকমের টকশো হচ্ছে এবং সেখানে বিভিন্ন দিক থেকে অতিথি আসছেন, তারা তাদের মতামত দিচ্ছেন। আপনার কি মনে হয়, বর্তমানে যেসব টকশো হচ্ছে সেখানে বাংলাদেশে যে বিদ্যমান চিন্তাভাবনা আছে, মতামত আছে বিভিন্ন বিষয়ে সবই রিফ্লেক্টেড হচ্ছে নাকি একটা নির্দিষ্ট লাইনে চলছে সব।
উত্তর: একটা সেলফ সেন্সরশিপ কাজ করছে অনেকের মধ্যেই। সত্যের দেখা খুব কম পাওয়া যায়। অনেকেই সত্যকে বলার সময় ৫০ বার চিন্তা করেন, কি না কি হয়। হয়তো হবে না। তবে এখন স্বাধীনতা আছে, এটা সত্য, এটা স্বীকার করতে হবে। এখন বলা যায়, লেখা যায়, কিন্তু পেছনে একটা ভয় আছে যদি কিছু হয় অর্থাৎ সেলফ সেন্সরশিপ। সেলফ সেন্সরশিপ মানে হলো সত্য অনেক সময় হারিয়ে যায়। কারণ আপনি কমেপ্রামাইজ করছেন। আমি কমেপ্রামাইজ করি। আমি প্রতিনিয়ত কমেপ্রামাইজ করি, করতে হয়, করতে হচ্ছে। সিস্টেমের অবস্থা হয়ে গেছে এরকম। সব লিখে দিবেন কিছু হবে তা না, কেউ এসে আপনাকে এখন বলে না যে আপনি লিখতে পারবেন না। কেউ বলে না, কিন্তু তারপরেও আমার অভ্যাস হয়ে গেছে এরকম যে, আমি জানি বলছে যে করবে না, কিন্তু কাল সকালবেলা যে আমার উপরে হবে না- তার গ্যারান্টি কি?
প্রশ্ন: তারপর তো এখন আরেকটা যোগ হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হেনস্তা ও সেটা তো খুবই প্রবল।
উত্তর: প্রবল মানে কি! এটার তো কোনো বর্ডার নাই। আপনি যা ইচ্ছা তাই করছেন, যেকোনো মুহূর্তে আপনাকে হেনস্তা করা যেকোনো মুহূর্তে আপনাকে হিউমিলেট করা এবং মিথ্যা তথ্য দিয়ে-এটার জবাব কে দিবে? জবাবও কেউ দিতে পারছে না এবং কোনো প্রোটেকশন আপনি পাবেন না। আইন থাকলে তো আইনের প্রয়োগ থাকতে হবে। সেটা হয় না আর কেউ কিছু মানছে না তো কোথা থেকে কে কি দিয়ে দিচ্ছে, আপনি কথা বলাটাও এখন বিপজ্জনক।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে এখন দেখা যাচ্ছে যে, একটা ঘরানার লোকজন ধরুন আওয়ামী লীগ কিছুটা বামপন্থি ওয়ার্কার্স পার্টি যা সব এই ঘরানাটাকে রাজনীতির বাইরে রাখা হয়েছে তাদের অনেক নেতাকর্মী জেলে, অনেক নেতাকর্মী বিদেশে চলে গেছেন। বাংলাদেশের দু’টি ঘরানা। একটি ঘরানা যাদের নির্বাচনেও আসতে দেয়া হয়নি। আপনার কি মনে হয়, যে ঘরানার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ছিল একসময়, এখনো আছে তাদের কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ, তাদের বাইরে রেখে যদি দেশের রাজনীতি পরিচালনা করা হয় তাহলে এই রাজনীতি কী দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকতে পারবে?
উত্তর: মোটেই না, এটা হতে পারে না। আমি মুক্ত চিন্তার মানুষ। আমি সব মত-পথের বিশ্বাসী। আমি দেখছি যে, আমি জানি এই মতকে আমি ইনভাইট করলে আমার বিপদ হতে পারে, সেই কারণে আমি ওই মতকে, আমি কাউকে ইনভাইট করি না। কারণ আমি জানি যে এদের আনলে ঝামেলা হতে পারে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আপনাকে আমি সত্য কথা বলি, আমি জানি এটা নিয়ে আমার বিপদ হবে। এটার জন্য বিপজ্জনক হচ্ছে সাংবাদিকরা। সরকার কিছু বলবে বলে আমার মনে হয় না আপনি কাউকে ইনভাইট করলে। কিন্তু বিপদ হচ্ছে আমাদের নিজেদের মধ্যে থেকে। এটা আগে ছিল না। এত দলীয়করণ, এত দলবাজি এটা হতে পারে? আপনার মনের মধ্যে পলিটিঙ থাকতেই পারে। কেজি মোস্তফা, এবিএম মূসা, নির্মল সেন, আহমেদ হুমায়ুন অথবা সালাম সাহেবদের মধ্যে অথবা মানিক মিয়া এদের পেটে রাজনীতি ছিল। কিন্তু কাগজে রিফ্লেকশন ছিল না। এখন তো আমার পরিচয় হচ্ছে সাংবাদিক না, আমি আগেই পরিচয় নিলাম রাজনীতিক; এই যে অবস্থাটা যেটা আপনি বলছেন এটা না পাল্টালে আমরা যেখানে ছিলাম এতে আরও খারাপ দিকেই যাবো। কারণ একটা একটা মতকে আপনি; সব মতের জন্য তো লড়াই করেছেন। সব মত যাতে ছিল না বলেই তো আপনি আন্দোলন হয়েছে, বিপ্লব হয়েছে। একটা মত থাকলোই না তাহলে আপনার কীভাবে হলো? তাহলে তো আর গণতন্ত্র হলো না। মুশকিলটা হচ্ছে যে, আগে হয়তো দেয় নাই এখন করতে দিবো কেন? এই হচ্ছে পরিস্থিতি। এটা বদলানো দরকার। আগে তো স্বাধীনতা দেননি তাহলে ওরা কেন স্বাধীনতা পাবে। এটুকু বলতে পারি, মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি।
প্রশ্ন: এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশের রাজনীতি আগামী পাঁচ, দশ বছরে কোনদিকে যেতে পারে বলে মনে করেন?
উত্তর: মানুষ রাজনীতিবিমুখ হয়েছে অনেকখানি। তরুণ সমাজের মধ্যেও কিন্তু ৫ই আগস্টে যে উৎসাহ ছিল আজকের দিনে যদি আপনি সেই অবস্থায় যেতে চান তাহলে দেখবেন আপনি সেখানে নেই। অর্থাৎ সবাই ইন্টারেস্ট হারিয়ে ফেলছে। মানুষ তো পরিবর্তন চেয়েছে কি কারণে? খালি হাসিনার পরিবর্তে মি. এঙকে বসিয়ে দেয়ার জন্য তো নয়। এটা পরিবর্তন হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে অন্তর্বর্তী প্রশাসন বা অন্তর্বর্তী সরকার তাদের হাতে গোল্ডেন অপরচুনিটি ছিল। তারা সেটা কাজে লাগাতে পারেননি। তারা বরং এসে একই ফর্মুলায়, একই কাজ করেছেন। প্রতিহিংসা করতে গিয়ে সমস্যা হয়েছে। এটা ধারাবাহিকভাবে চলছে। প্রশ্ন ছিল, পাঁচ দশ বছর পর কোথায় যাবো আমরা? আমি এতদূর দেখি না। মানুষ এতটাই বীতশ্রদ্ধ যে, রাজনীতি বুঝি না ভাই- আমার দরকার নাই রাজনীতির, কিন্তু আমার পেটে ভাত চাই। এই যে রফিক আজাদ যেটা লিখেছিলেন, ভাত দে হারামজাদা না হয় মানচিত্র খাবো। আজকে সেই পরিস্থিতির দিকে যদি যাই- এর জন্য দায়ী কে হবে?
মিডিয়ার লোক হিসেবে আমি তো একাধিকবার চাকরি হারিয়েছি। একাধিকবার জেলে গেছি। শেখ হাসিনার জমানায় আমি আট মাস দেশেই ফিরতে পারিনি এবং ২রা আগস্ট আমাকে দেশের বাইরে চলে যেতে হয়েছিল এই ২০২৪-এ সেটা তো লম্বা ইতিহাস কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে যে আমি তো দেখতেছি যে, একই জিনিসই। আমি তো একটা কাগজ চালাই। কাগজ চালাতে আমাকে প্রতিদিন কমেপ্রামাইজ করতে হচ্ছে। কমেপ্রামাইজ করলে আসল সত্যটা বের হবে না। কারণ আমি চিন্তা করি- এটা দিলে বোধহয় ঠিক হবে না, এটা দিলে অমুকের প্রতি কী হবে। বিজ্ঞাপন একটা বিরাট সমস্যা। বিজ্ঞাপনের জন্য যদি কমেপ্রামাইজ করতে হয়। নানা ধরনের কমেপ্রামাইজ আর কি। আমাদের দুর্ভাগ্য হচ্ছে রিপোর্টাররা আগেই কমেপ্রামাইজ করে বসে থাকে। আপনাকে এসে সত্য কথাটা বলে না, যে এই ঘটনাটা ঘটেছিল, এটা বলে না, সেই কমেপ্রামাইজ হয়ে আসে। এটা আগে ছিল না। রাজনীতি আমাদেরকে শেষ করে ফেলছে। এই অসুস্থ নোংরা রাজনীতি বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে একদম টুকরো টুকরো করে ফেলছে। আমরা এখান থেকে বের হতে পারছি না। আজকে যে সংকটের কথা বলছেন, এই সংকটের মূলে হচ্ছে আমরা ঐক্যবদ্ধ নই।
জাতীয় প্রেস ক্লাবে, আপনার মতের সঙ্গে আমি একমত না এজন্য আমার মেম্বারশিপ বাতিল, হাউ ইট ইজ পসিবল! এটা তো চিন্তা করা যায় না। ঢালাওভাবে সাংবাদিকদের সদস্যপদ বাতিল করা হয়েছে। কেউ ক্রিমিনাল অফেন্স করে থাকলে তার বিরুদ্ধে অ্যাকশন হতে পারে, মামলা হতে পারে, সবকিছু হতে পারে। এটা না করে সবাইকে আপনি আলাদা করে দিয়েছেন। এই অবস্থারই তো পরিবর্তন হয়নি। আমরা ডেমোক্রেসির কথা বলছিলাম, আমরা একটা ধারালো ছুরার উপরে দাঁড়িয়ে আছি। এই হলো গণতন্ত্র। নামলেই বাঘে খেয়ে ফেলবে।
প্রশ্ন: আপনি বলছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কথা তাদের একটা গোল্ডেন অপরচুনিটি ছিল। তারা ১৮ মাস ক্ষমতায় ছিল। ১৮ মাস বেশ লম্বা সময়। তারা এই পরিস্থিতিটাকে চেঞ্জ করতে পারেনি কেন? এটা কি তাদের সদিচ্ছার অভাব না কোনো চাপের মধ্যে ছিলেন তারা?
উত্তর: প্রেসার তো এটা নিজেরাই। রাজনীতি রাজনীতি বলতে গিয়ে একটা লাইন তারা বেছে নেন যে, এদেরকে আউট করতে হবে। অমুকরে আমার পছন্দ না। এ অমুক দল এরা হলো স্বৈরাচার, এদেরকে এখান থেকে কি করতে হবে? বাইর করতে হবে। এদের কোনো সুযোগ দেয়া যাবে না। এই যে টেলিভিশনগুলো দখল হলো, নিউজপেপার দখল হলো পালাবদলের ঘটনা ঘটলো, এটা ওই সময়ই তো ঘটেছে। তাহলে তারা কোনো প্রোটেকশন দিলো না কেন? তাদের তো প্রোটেকশন দেয়া উচিত ছিল। আমি চোখের সামনে দেখছি যে, আমার এডিটরের চাকরি নেই, নিউজ এডিটরের চাকরি নেই, চিফ রিপোর্টারের চাকরি নেই। চলে যাচ্ছে। কেউ এসে বলেনি, কেন আপনি চাকরি খাবেন? এটা আগে ছিল অন্যরকম। এরকমটা ঘটলে ইউনিয়ন দাঁড়িয়ে যেত। সেটা তো এখন নেই। সাংবাদিকদের দলবাজির কারণে আজকের এই পরিণতি। এটা আরও খারাপের দিকে যাবে বলে আমার ধারণা।
প্রশ্ন: আপনি তো কূটনৈতিক সাংবাদিক ছিলেন। এখনো লেখালেখি করেন এবং আপনার ইনসাইড সোর্স আছে। এখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি যেভাবে যাচ্ছে সেটা তো সবাই দেখতে পাচ্ছে, কীভাবে যাচ্ছে। ভারতের সঙ্গে একটা ডিস্টেন্স তৈরি করে চায়না আমেরিকার সঙ্গে আরেকটু ক্লোজ হওয়ার। কিন্তু এর মধ্যে যে হাসিনা ফ্যাক্টর, বাংলাদেশ সরকার বলছে যে, এটা একটা সমস্যা তৈরি করছে। ভারত সরকারের কথায় মনে হচ্ছে না তারা এটাকে রিকগনাইজ করে। তো আপনার কি মনে হয় যে, এই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে হাসিনা ফ্যাক্টরটা কি মূল না এর পেছনে আরও অন্য বিষয় আছে?
প্রশ্ন: হাসিনা ফ্যাক্টর বরং তাদের জন্য বিরক্তিকর। কারণ হচ্ছে এই, এই কার্ড খেললে তারা লাভবান হবে না, এটা তারা ভালো করেই জানে। কারণটা হচ্ছে এখানে চায়না ফ্যাক্টর। তারা দেখতে চায় যে, চায়না কতোদূর যাবে? কীভাবে যাবে? সেটা নিয়ে তারা তাদের মধ্যে একটা সংশয় সন্দেহের ব্যাপার আছে। এটা ইন্ডিয়ান ভাষ্য বলছি। আর বাংলাদেশ বলছে, এটা আমি তো কারও কাছ থেকে নিতে পারবো না। আমার ফরেন পলিসি তা বলে না। আমরা যেহেতু মুক্তভাবে চিন্তা করি, ঠিক আছে আমি আমার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য, আমার ইনভেস্টমেন্টের জন্য, আমি চীনের দিকে যেতে পারি। আমি আমেরিকার দিকে যেতে পারি। অন্য দেশে যেতে পারি। কিন্তু আমি একেবারেই শুধু ভারতনির্ভর হবো না। ভারতনির্ভর হওয়ার কারণে শেখ হাসিনার কি অবস্থা আমরা তো দেখলাম। সে সময় বেশির ভাগ প্রজেক্টের ফান্ডিং চায়না থেকে হয়েছে। ইভেন আমেরিকান ইকোনমিনির্ভর করে অনেকটা চায়নার উপরে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেকগুলো বিষয় আছে। সন্দেহ আর অবিশ্বাস। আরেকটা হচ্ছে কিছুটা দাদাগিরিও আছে। সেই কারণে তারা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে চান। ইউনূস সাহেবের সরকারের সময় দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। বলতে পারেন তাদের সময় একদম এন্টি-ইন্ডিয়ান পলিটিঙটা অল টাইম হাই হয়েছিল। তার ধারাবাহিকতা কিন্তু এখনো চলতেছে। বেগম খালেদা জিয়া মারা যাওয়ার পরে ভারত থেকে জয়শঙ্কর এলেন, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলেন তখন লোকসভার স্পিকার এবং পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি এলেন। তারা চাইলেন যে, সম্পর্কটা ভালো হোক।
তাহলে গোলমালটা কোথায় হলো? গোলমালটা হলো দিল্লিতে এখন এই মুহূর্তে বাংলাদেশ দেখাশোনা করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। আগে করতো সাউথ ব্লক। সাউথ ব্লক আর করে না। সে কারণে এটা ডিফেন্স অপিনিয়ন হয়ে গেছে তাদের মধ্যেই। যে কারণে তারা একজন পলিটিশিয়ানকে হাইকমিশনার করে ঢাকায় পাঠিয়েছে। তাদের মধ্যে একটা কনফিউশন আছে। কিন্তু মুশকিলটা হচ্ছে শেখ হাসিনাকে তারা প্রোটেকশন দিতে গিয়ে বিশেষ করে সবশেষ শেখ হাসিনার বিষয়ে যা ঘটলো। এটা ঘটার কথা ছিল না। কারণ বাংলাদেশের তরফ থেকে বলা হয়েছিল যে, ইন্ডিয়ান কোনো জার্নালিস্ট যেন প্রশ্ন না করে। তো সেটা ভায়োলেট করা হয়েছে। ইন্ডিয়ান জার্নালিস্ট কেন, বাংলাদেশি জার্নালিস্টও প্রশ্ন করেছে।
আপনি লক্ষ্য করবেন যে, একটা বিবৃতি এলো। বিবৃতির ভাষা সাধারণত সেগুনবাগিচায় তৈরি হয় না। এটা পলিটিক্যাল এবং এটাকে অনেক ক্ষেত্রে বলা হয় ঐতিহাসিক। খুব হার্ড। সেই বিবৃতির পরে এখন নতুন একটা ডেভেলপমেন্ট হতে যাচ্ছে। সেটা হচ্ছে যে, তাদের মধ্যে একটা রিয়ালাইজেশন আসছে যে, শেখ হাসিনা কার্ডে আমরা কতোদূর যাবো? দুই দেশের মধ্যে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভিসা বন্ধ হওয়ার কারণে কলকাতার যত রকমের ব্যবসা-বাণিজ্য- শাড়ির দোকানই বলেন আর হোটেলই বলেন, হাসপাতালই বলেন, সবই কিন্তু বাংলাদেশের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে। এখন তারা চিন্তা করছেন যে, আবার সম্পর্কটা রিশেপ দেয়া যায় কিনা। সেই কারণে সম্ভবত ভারতের পররাষ্ট্র সচিব আসছেন তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য।
প্রশ্ন: তো তারেক রহমানকে তো নরেন্দ্র মোদি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ফেব্রুয়ারি মাসে।
উত্তর: হ্যাঁ দিয়েছিলেন। মাঝখানে একটা গোলমাল হয়ে গেল বিমসটেক-এর দাওয়াতে নিয়ে। প্রধানমন্ত্রীকে দাওয়াত না দিয়ে তারা বিমসটেক-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দিয়েছেন। এতে তারা প্রাইম মিনিস্টার উল্লেখ করেন নি। এটা নিয়ে আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়নি, বাংলাদেশ বলছে যে, আমরা এই ইনভাইটেশনে যাচ্ছি না। প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত আগামী মাসে যাবেন। খুব স্বল্প সময়ের জন্য যাবেন এ ধরনের কথাবার্তা হচ্ছে। আমরা যখন কথা বলছি তখন বোধহয় ভারতীয় হাইকমিশনার বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন এবং ১০ তারিখ ভারতীয় হাইকমিশনার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এই সাক্ষাৎটা প্রথম। অনেক ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে, আবার যতটুকু মনে হয়েছিল যে, একদম বোধহয় হিমশীতল হয়ে গেল, একদম মানে একেবারে ভেঙে গেল, মানে আলোচনার টেবিলে আসবে না তা না।
আলোচনার টেবিলে ফিরে আসছে এবং সফর হবে। তবে একটু সন্দেহ থেকেই যাবে। কারণ বাংলাদেশের ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক তো নানা ধরনের। শেখ হাসিনার কার্ডটা এখানে কিন্তু ভারতীয় জনতা পার্টির কয়েকজন নেতা অতি উৎসাহী হয়ে এই কাজটি করেছে। ফরেন অফিস না করেছিল আমি যেটা শুনেছি। তারা বলেছিল যে, এটা ঠিক হবে না। কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে কথা বলতে দেয়ার কথা না, তাকে কেন আপনি কথা বলতে দিচ্ছেন? আর যেহেতু আপত্তি করেছে তো আমরা এটা অন্যভাবে ডিল করি। তো সেটাও একটা ছিল চাপ সৃষ্টি করা এই সেই। তো চাপ সৃষ্টি করতে গিয়ে এই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কটা একটা ফারাক তৈরি হয়েছিল। যাই হোক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কিন্তু আবার মোটামুটি আলোচনার টেবিলে ফিরে আসছেন দুই পক্ষই।
প্রশ্ন: শেখ হাসিনা তো এর আগেও এফসিসি ক্লাবেই অডিও ভাষণ দিয়েছেন। তখন কিন্তু এত প্রতিক্রিয়া হয়নি...
প্রশ্ন: না তখন হয়নি। এটা জানুয়ারি মাসের কথা। আর এখন যেটা হচ্ছে যে গালফ অফ ডিফারেন্স আছে এখন তো পুরো জিনিসটাই একেবারে পুরো ওয়ার্ল্ড প্রেসকে সামনে রেখে, লোকাল প্রেসকে দিয়েও তিনি কথা বলছেন। আর এটা তো ছিল অডিও। এটাও অডিও, কিন্তু এটা ভিন্ন মাত্রার অডিও। উনি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। আগেরটা প্রশ্ন-উত্তর ছিল না।
প্রশ্ন: শুরুতে আপনার ক্যারিয়ার নিয়ে কথা বলেছিলেন। বাহাত্তর সাল, এরপর চুয়াত্তর এবং পঁচাত্তরে স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট নিয়ে নানা ঘটনা ঘটেছিল...তখন সাংবাদিকতার একটা শক্তি ছিল?
উত্তর: আমি চুয়াত্তরেই চাকরি হারাই। ১৭ই মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও করেছিল জাসদ। বাংলার বাণীতে ওই রিপোর্ট লিখেছিলাম। সেই রিপোর্ট লেখার কারণেই আমার চাকরিটা চলে গিয়েছিল। চাকরি হারালাম তো অনেকবার। সেসময় সাংবাদিকতার একটা কোয়ালিটি ছিল, এত রাজনীতি ছিল না। সাংবাদিকতাই হতো, এখন তো সাংবাদিকতা হয় না। এখন রাজনীতি হয়। আমি আপনাকে তুলবো, আপনাকে নামাবো আমার ফায়দা নেয়ার জন্য। আমি কিছু একটা হবো- এই হওয়ার জন্যই আজকের ক্রাইসিস। আরেকটা জিনিস হচ্ছে, প্রাপ্তি এত বেশি, আমরা মনে করি যে, এত তাড়াতাড়ি। মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী আর বাঙালি ব্যবসায়ীর মধ্যে পার্থক্য কি জানেন, মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা আজকে ইনভেস্ট করে ছয় মাস পরে রেজাল্ট চায় আর আমাদের ব্যবসায়ীরা আজকে ইনভেস্ট করে কাল সকালবেলা রেজাল্ট চায়।
আমাদের গোত্রের মানুষরাই মনে করেন যে, সময় চলে যাচ্ছে এখনই আমার ফায়দা নিতে হবে। কিন্তু আমরা যা করছি তা সাংবাদিকতার জন্য না- আমার নিজের জন্য। এটাই হচ্ছে দুর্ভাগ্য। শাসকেরা এই সুযোগটা নেয়। শেখ হাসিনা সুযোগ নিয়েছিলেন, এখন যে সরকার তারা যদি সুযোগ নেন তারাও বিপদে পড়বেন। আমার ধারণা তারা সেখান থেকে কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছেন যে, একটু কমেপ্রামাইজ করতে হবে, না হলে হবে না। আপনি জানেন আল্লাহতায়ালা প্রশংসা পছন্দ করেন, কোনো শাসক প্রশংসা পছন্দ করবেন না? সেই জায়গায় আপনি তো ধরেই রাখছেন যে, এইরকম অবস্থা। আবার বলছি, এই পুরো পরিস্থিতি পাল্টাতে হলে আমাদেরকে পাল্টাতে হবে এবং সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমকে সরকারকেই তো জবাবদিহিতা করতে হবে। সরকারের প্রশংসা করলে তো চলবে না।
রাজনীতি ঢোকার কারণে- আরে অমুক আমার বিরুদ্ধে বলে দিলো! এই যে বলাটা এটা আগে ছিল না। নির্মল দা’র সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক ছিল না? নির্মল দা তো লিখেছেন, শিরোনামটা ছিল, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই! ভাবতে পারেন, দৈনিক বাংলা, সরকারি পত্রিকা। স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই। আজকে লেখা যায়, লেখা যায়, আমি তো লিখেছি অনেকগুলো। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমার নিজের মধ্যেই, নিজের মধ্যে মানে আমাদের মধ্যেই যে এরা ওই যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমি একটা রিপোর্ট লিখেছিলাম আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করবেন, আপনার জানার কথা, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলে আমি একটা স্টোরি করেছিলাম যে, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন এই মর্মে কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। এর পরে এটা আমাকে ফেস করতে হয়েছে নানাভাবে। তখনকার সরকার তো অনেক ঝামেলা...যাই হোক তারা কিন্তু আমাদের কমিউনিটির লোকজন সবচাইতে বেশি সর্বনাশ করে ফেলছেন, ভাই আপনি...। আমি বললাম কি সর্বনাশ করলাম? সর্বনাশটা কি করলাম বলেন। আমি একটা সত্য বের করার চেষ্টা করেছি। আপনারা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কথা বলবেন, আর এটা মানবেন না, এটা তো হতে পারে না।
হারিস চৌধুরী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব ছিলেন। ১৪ বছর ঢাকার পান্থপথে লুকিয়ে ছিলেন একজন প্রফেসরের পরিচয় দিয়ে। এই খবরটা আমি প্রথম বের করেছিলাম। এরপরে আমাদের সাংবাদিকরা আমাকে তো পারলে আরে ভাই এটা গল্প লিখছেন, এই সেই- তো আখেরে প্রমাণিত হয়েছে যে, আমি সঠিক ছিলাম।
আরেকটা সত্য কথা, আমি কাগজ চালাই তো, ভালো ছেলে, ভালো মেয়েরা এখন আর সাংবাদিকতায় আসে না। কোয়ালিটি ম্যাটারস। আপনি বিবিসিতে কাজ করেন, কাজ করে আসছেন, ভয়েস অফ আমেরিকাতে কাজ করেছেন। আমি ২৮ বছর ভয়েস অফ আমেরিকাতে কাজ করেছি। কিন্তু কোয়ালিটি আসলেই দরকার। কোয়ালিটি নেই। প্রতিদিন আপনাকে কমেপ্রামাইজ করতে হবে।
এখন বিপদ হয়ে গেছে অনলাইন। রিপোর্টাররা অনলাইন দেখে কপি করতেছে। তো আপনি জানবেন কি? আপনার তো আর কিছুই জানা নেই। আদার সাইডে ওই মিটিংটাতে আর কী কী হয়েছে আপনি জানবেন কী করে? যে অনলাইন থেকে সে কপি করলো ওটা তো তার স্বার্থে হতে পারে। সে কমেপ্রামাইজ করেছে একরকম। তো আপনি তার কমেপ্রামাইজের সঙ্গে আপনি নিজেকে সঁপে দিলেন। তো তাহলে কি দাঁড়ালো? রেজাল্ট হলো যে, আপনি সত্যটা জানতে পারলেন না। পুরো সত্যটা জানতে পারলেন না।
অনুলিখন: মোহাম্মদ রায়হান