ঐতিহাসিক জুলাই। বাংলাদেশের ইতিহাসেও স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে মাসটির নাম। জুলাই মাসটির নাম এসেছে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের নামানুসারে। ইতিহাস বলে জুলিয়াসের তিন স্ত্রী ছিলেন। জানা যায়, জুলিয়াস সিজারের ২ স্ত্রী কোরনেলিয়া ও কালপর্নিয়া তাদের নিজস্ব ভূমিকায় স্মরণীয় অবদান রেখেছিলেন। বিস্তর ইতিহাসে না যাই। তবে তারা এক অনন্য রাজনৈতিক ও মানবিক প্রভাব ফেলেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস তাদের কতোটুকু ধরে রেখেছে? কতোটুকুই বা মনে রেখেছে জুলিয়াসকে!
জুলাই ২০২৪। মনে হয় এই তো সেদিনের কথা। এখনো চোখের সামনে ভাসছে। মনে ভয়, কখন কী হয়। একটি বছর কেটে গেছে। নারীরা বীরদর্পে স্বৈরাচার পতনের আন্দোলন করেছেন। এ যেন সুউচ্চ ও বিশাল পাথর ঠেলে সরানো। জীবন হারানোর শঙ্কা। ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বন্দ্ব। কিন্তু তাদের বুকে ছিল সাহস- ইয়েস ইউ ক্যান ডু ইট। পেছনে ফেরার সুযোগ নেই। মিছিলের সামনের সারিতে নারীদের অবস্থান। কেউ বলছে না, এত রাতে বাইরে কী? তোমার পাশের ছেলেটা কে? ওড়না ঠিক নেই কেন? শত শত মা সন্তানকে নিয়ে এসেছিলেন রাজপথে।
এটাই কী তবে দ্বিতীয় স্বাধীনতা? এটা আলোচনাযোগ্য বিষয়। এই আলোচনাটা পাশে রাখি। বর্তমানে ফিরে আসি। নতুন বাংলাদেশে ১১ মাস হয়ে গেল। চোখে কতো স্বপ্ন, কতো আশা। হাজারো প্রত্যাশা। তবে প্রত্যাশা যে পূরণ হয়নি এটা তো বলাই যায়। শিক্ষার্থীরা জাতীয় বীর। তারা দেশের কাজে রাস্তায় এসেছিলেন। তাজা রক্তের বিনিময়ে স্বৈরশাসককে সরিয়েছেন। তবে হাজারটা বিষয়ের মতো উন্নত হয়নি নারীদের বিষয়টিও।
নারী সংস্কার কমিশন-নারীর ডাকে মৈত্রী যাত্রা। কতো সংস্কার কমিশনের কতো বিষয় নিয়ে কতোজনের দ্বিমত। তাতে সমস্যা নেই। সমস্যা শুধু নারী সংস্কার কমিশনের মতামত নিয়ে। দ্বিমত থাকবে এটাই সৌন্দর্য। অন্যান্য কমিশনে এটা সৌন্দর্য হলেও এই কমিশনে যেনো অপরাধ। তবে হ্যাঁ এই কমিশনে সকল শ্রেণির স্টেকহোল্ডাররা ছিলেন না। যার কারণে অনেকটা গুরুত্ব হারিয়েছে। নারীরা কেন যাত্রা করলেন- তারা কী চান? তাদের চাওয়া নিয়ে আপনার দ্বিমত থাকতেই পারে। কিন্তু মুখ্য কিন্তু সেই পোশাক। খোলামেলা পোশাকই কিন্তু শুধু সমস্যা না। সমস্যা বোরকা পরে মুখ ঠেকে সংবাদ সম্মেলন করলেও। খোলামেলা পোশাকে রাজনীতি করা অপরাধ একদলের চোখে। আরেক দলের চোখে মহা অপরাধ বোরকা পরে বা মুখ ঢেকে রাজনীতি করা। তাদের চোখে কি তবে নারীদের রাজনীতি করাটাই সমস্যা?
হাতে ফোন আর ইন্টারনেট। মননে যে বিষ। একজন চিকিৎসকের ভিডিও দেখেছেন প্রায় সবাই। ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত। উন্নত স্বাদের জীবন ছেড়ে এসেছেন দেশে। করছেন রাজনীতি। কিন্তু তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা বললেন, মিলন শেখানো মানুষ, কীভাবে দেশ চালাবে? এরকম কথা বলা মানুষগুলো আবার নেট দুনিয়ায় বীর। ভাবা যায়? এখন আরেকটি আলোচনা চলছে নারীদের জন্য ১০০ আসন। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বেঁধে দেয়া আসন চাই। গুরুত্বপূর্ণও বটে। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কেন ১০০ আসনের প্রয়োজন হলো? নারীদের আসন যত বাড়বে ধরে নিতে হবে নারীরা ততটাই পশ্চাৎপদ। ইউনিয়ন পরিষদে একজন নারী ভাইস চেয়ারম্যান থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু তার হাতে ক্ষমতা কতোটা? সীমিত বা নাই বললেও মনে হয় ভুল হবে না।
কতো শিক্ষিত-সচেতন মানুষ আছেন যারা নেত্রী বা নারীর ছবির নিচে পোস্ট করেন, রাতের খাবার। তারাই আবার গলা ফাটায় দেশে ভালো কিছু হয় না। এ কেমন দেশ! চলতি বছরের মে মাসে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩৬৮টি ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। পূর্ববর্তী মাসে এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা ছিল ৩৬২টি। আছিয়া নামে একটি ছোট্ট শিশুর ধর্ষণ নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছে। এদেশে তো আলোচনায় না এলে, ভাইরাল না হলে বিচার চাওয়াটাও মনে হয় অন্যায়। এই শিশুটি সবাইকে কাঁদিয়ে পরপারে চলে গেছে। তার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল আপামর জনতা। রায়ও হয়েছে সে অভিযুক্তের। মৃত্যুদণ্ড। সাধুবাদ জানাই। কিন্তু একই সময়ে আরেকটি শিশুও ধর্ষণের শিকার হয়। তার বাবা ধর্ষণের প্রতিবাদ করায় বাবাকে হত্যা করা হয়। কিন্তু ঘটনাটি ভাইরাল হলেও আমরা ছিলাম চুপ। ভাবতেই গা শিওরে ওঠে এই মেয়েটার সারা জীবন কতোটা কষ্টে কাটবে। কুমিল্লার মুরাদনগরে নারীর উন্মুক্ত শরীরের ভিডিও ভাইরাল হলো। কতোটা নির্লজ্জ আমরা এমন ভিডিও নেট দুনিয়ায় ছেড়ে দেই। একজন মাকে উন্মুক্ত করে দেই। এরপর আবার সেই পুরনো চিত্র। শুরু হলো রাজনৈতিক ফায়দা আদায়। কে কোন দলকে দোষারোপ করতে পারে। ভিকটিমকে ফের ভিকটিম বানানোর প্রতিযোগিতা। কিন্তু প্রকৃত অপরাধীকে নিয়ে কতোটা সিরিয়াস আমরা। ধর্ষণের ঘটনা সামনে আসলেই স্ট্যাটাস দেখি- প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া হোক। আচ্ছা প্রকাশ্যে ফাঁসি না দেন বিচারের দৃষ্টান্তই না হয় স্থাপন করুন। যাতে এমন অপরাধ করার আগে দশবার ভাবে।
পরিবর্তন চাই পরিবর্তন। পরিবর্তনটা করেন এসি রুমে বসেই। তবে এর সুফল এসি, নন-এসি দুই গ্রুপের মানুষই যেনো পান। আরেকটা সংস্কৃতির পরিবর্তন চাই। ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে। আমার মতে, এটা আরেকটা জঘন্যতম সংস্কৃতি। সমপ্রতি একজন সংগীত শিল্পীর বিয়ে হলো তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো নারীর সঙ্গে। কেন! তার সঙ্গেই কেন! এরমাধ্যমে ধর্ষণকে কি আরও উৎসাহিত করা হলো না? নির্যাতিতার পরিবারকে চাপ সৃষ্টি করে বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারলেই অপরাধ লঘু। এই সুযোগ মানুষ নিতে চাইবে- এটাই স্বাভাবিক। একজন ধর্ষকের সঙ্গে সেই নারী সারাজীবন কীভাবে কাটাবে? কোনোদিন কি মন থেকে মেনে নিতে পারবেন। কখনোই পারবেন না সেই নারী। একজন ধর্ষককে স্বামী হিসেবে মেনে নেয়াটাও একটা শাস্তি। আর সেই অপরাধী ব্যক্তিটা কিন্তু ট্রফির মতো পেয়ে যান সেই নারীকে। বিয়ের মাধ্যমে ধর্ষণের মতো নিকৃষ্ট অপরাধকে সামাজিক ও কেতাবি স্বীকৃতি দেয়া হয়। কতো ধর্ষণ থেকে যায় আলোচনার বাইরে। কতো ধর্ষণের ঘটনা লিপিবদ্ধ হয় না। টাকা, ভয়ভীতি দিয়ে চুপ করানো হয়।
আমাদের সমাজে ব্যর্থতাটা যেন শুধু নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। একজন নারীর ব্যর্থতা যেন পুরো নারী সমাজের ব্যর্থতা বয়ে আনে! আমরা চাই একজন নিখুঁত, স্বাবলম্বী, প্রজ্ঞাবান নারী। এখান থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম হলেই পুরো সমাজের আঙ্গুল নারীর দিকে। আর এই নারীই যখন রাজনীতির মাঠে তখন তো প্রশ্নের শেষ নেই। রাজনীতিতে নাম লেখালে সমালোচনার শেষ নেই। রাজনৈতিক রোষানলে পরে কখনো কখনো একজন নারী হয়ে উঠেন ‘ভিকটিম’ বা ‘গসিপ ম্যাটারিয়াল’। তারা রাজনৈতিক চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে জায়গা পান খুবই কম। কখনো কখনো নারীকে নিয়েই রাজনীতি যেন তুঙ্গে। এই নারী ইস্যুকে কেন্দ্র করেই কেউ কেউ নিজেদের ফায়দা লুটতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
এখন তো কাউকে দমিয়ে রাখার নতুন মাধ্যম হয়েছে ডিজিটাল সহিংসতা। তবে এই ক্ষেত্রেও বরাবরের মতই ভিকটিম যেন শুধু নারী। নারী রাজনৈতিকদের ওপর ট্রোল, মিম, বাজে কমেন্ট তাদের কণ্ঠরোধ করে। কখনো কখনো তাদের ব্যক্তিজীবনকে সামনে এনে হাস্যরসের সৃষ্টি করে। এ ছাড়াও কোনো নারী রাজনীতিতে পা দিলেই অন্যদের মাথায় আগে চিন্তা আসে, সে কার লোক! কে তাকে উপরে তুলছে! খুঁটির জোর কোথায় কিংবা কার হাতের পুতুল! কিন্তু তার সম্মান আর সংগ্রাম যেন এখানে নগণ্য। আর যখন নারীটা প্রতিবাদী হয়ে উঠে তখন বলা হয়, নারীরা আমাদের মা-বোন। আমরা মায়ের জাতিকে সম্মান করি। কিন্তু পর্দার আড়ালে আবার এই মায়ের জাতি নিয়েই করা হয় হাসাহাসি। সম্মান দেয়ার নামে যেন মায়ের জাতিরই গলা চেপে ধরা হয়।
আবারো বলতে হয় মননের সংস্কার করবে কে? কয়েক মাস আগের কথা। বাংলাদেশে খেলতে এসেছিল আয়ারল্যান্ড নারী ক্রিকেট দল। বিজয় সরণি মোড়ে নারীদের বহন করা বাসটা এসে দাঁড়ালো। আমার ঠিক পাশের এক বাইকে থাকা পোশাক পরিচ্ছদে ভদ্রলোক বলে বসলেন, মেয়ে মানুষ হয়ে আবার ক্রিকেট খেলে? এই পরিপাটি পোশাকওয়ালা লোকের মননে পরিবর্তন আনবে কে? এইচএসসি পরীক্ষা চলছে। ক’দিন পরেই হাস্যরস দিয়ে স্ট্যাটাস দেয়া শুরু হবে। ফেল করলে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেবে আর ছেলেকে রিকশা কিনে দেবে। ভাবা যায়, কৌতুক করতে গিয়েও আমরা পিছিয়ে দিচ্ছি নারীদের। কেন বলা হয় না, ফেল করলে মেয়েকে গার্মেন্টসে দিয়ে দিবো। ইয়ার্কির মাঝেও মেয়েদের স্বাবলম্বী করতে মানা। আর এই সমাজে বিয়েটা যেনো এক প্রকারের শাস্তি। বিয়ে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভাবনাটা এমন, মেয়ে সুন্দর বিয়ে দিয়ে দাও, পরে ছেলেরা পিছু নেবে। মেয়ে কালো বিয়ে দিয়ে দাও, পরে ছেলে পাওয়া যাবে না। মেয়ে মোটা বিয়ে দিয়ে দাও, চিকন বিয়ে দিয়ে দাও। এমনকি পড়ালেখায় ভালো বিয়ে দিয়ে দাও, পরে শেয়ানা হয়ে যাবে। আর যদি কোনোভাবে রাজনীতিতে নাম লেখায়, সে তো কিনা কী। আবার এত পরিচিত নেত্রী তিনি কেন বিয়ে করেননি এটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি কী বলছেন, কতোটা যুদ্ধ করেছেন, তার জীবনের গল্প এসব যেনো নস্যি। নারীর দিকে কাদা ছোড়া একটু বেশিই সহজ। কিন্তু মনে রাখা উচিত একটা নারীর লড়াইয়ের পেছনে শুধু নারী নেতৃত্ব নয় নারীর মাধ্যমে এ সমাজের সিদ্ধান্তই বাস্তবায়িত হয়।